শব্দ ও কথার উৎপত্তি

ঘরের শত্রু বিভীষণ

আপনজন হয়েও শত্রুর মতো কাজ করলে আমরা তাকে ঘরের শত্রু বিভীষণ বলে থাকি। কথাটির উৎপত্তির পেছনে রয়েছে বিরাট এক পৌরাণিক কাহিনি। আসুন জেনে নেওয়া যাক।

বিভীষণ ছিল রাবণের ছোটো ভাই। রাবণ, বিভীষণ ও কুম্ভকর্ণ ছিল তিন ভাই। তাদের মাতার নাম ছিল কৈকসী ওরফে নিকষা এবং মাতামহের নাম ছিল সুমালী। সুমালীর মাল্যবান ও মালী নামে আরও দুটি ভাই ছিল। একদিন তারা তিন ভাই সুমেরু পর্বতের গুহায় তপস্যায় মগ্ন ছিল। তাদের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে ব্রহ্মা তাদেরকে তিনটি বর দেন—তারা চিরজীবী, শত্রুঘ্ন এবং অজেয় হবে। বর পাওয়ার পরে তারা এমন উৎপাত শুরু করল যে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতা ও ঋষিরা মিলে বিষ্ণুর কাছে গিয়ে নালিশ করলেন। নালিশ শুনে বিষ্ণু তাদেরকে দমন করতে প্রবৃত্ত হলেন। স্বয়ং বিষ্ণুই মালীকে হত্যা করেন। তারপর বাকি দুই ভাই— সুমালী ও মাল্যবান তাদের অনুচর, পরিবার ও আপনজন নিয়ে পাতালপুরীতে অবস্থান নেয়।

তারা বিশ্বকর্মার সাহায্যে ত্রিকূট পর্বতে লঙ্কাপুরী তৈরি করে নিয়েছিল। তারা চলে যাওয়ার পর বিশ্রবা মুনির পুত্র কুবের সেখানে বসতি স্থাপন করেন। অল্পদিনেই তিনি প্রচুর প্রতিপত্তির মালিক হন এবং লঙ্কাপুরী জাঁকজমকে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর বহুকাল পরে সুমালী পাতাল থেকে পৃথিবীতে ভ্রমণে আসে। ঘুরতে ঘুরতে লঙ্কাপুরীতে এসে কুবেরের ঐশ্বর্য আর লঙ্কাপুরীর জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। তখন সে পুনরায় লঙ্কাপুরী দখল করার চিন্তা করতে থাকে। তার মাথায় তখন একটা বুদ্ধি আসে—বিশ্রবা মুনির সাথে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিলে তার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। ভাবনা অনুযায়ী সে তার মেয়ে কৈকসীকে বিশ্রবা মুনির নিকট পাঠায়। বিশ্রবা মুনি তখন ধ্যান করছিলেন। কৈকসী মুনির পাশে বসে মাটিতে দাগ টানতে আরম্ভ করে।

এক পর্যায়ে কৈকসীর দিকে বিশ্রবা মুনির নজর পড়ে। বিশ্রবা মুনি ধ্যান বন্ধ করে কৈকসীকে সেখানে আসার কারণ জানতে চাইলেন। কৈকসী তার পরিচয় দিলেও সেখানে আসার কারণ গোপন রাখে। উপরন্তু সে মুনিকে তপস্যাবলে তার আসার কারণ নির্ণয় করতে বলে। তারপর বিশ্রবা মুনি ধ্যানে বসে তার আসার কারণ জানতে পারলেন। বিশ্রবা মুনি তাকে জানিয়ে দিলেন যে তার ধ্যান ভাঙার কারণে কৈকসীর সন্তানরা রাক্ষস হবে এবং তারা হবে দুষ্ট প্রকৃতির রাক্ষস। কৈকসী কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করলে বিশ্রবা মুনি তার শাস্তি লঘু করেন—বলেন যে তার ছোটো ছেলে রাক্ষস হবে, সাথে সাথে ভীষণ ধার্মিকও। কৈকসীর সেই ধার্মিক-রাক্ষস ছেলেটিই হচ্ছে বিভীষণ।

তার অনেক পরে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা বনবাসে আসে। রাবণ তার বোনের স্বামী বিদ্যুজ্জিহ্বকে হত্যা করার পর তার বোন শূর্পণখাকে বনে আশ্রয় দেয়। সেখানে রামের সাথে শূর্পণখার পরিচয় হয় এবং তাকে প্রেম নিবেদন করে। রাম-লক্ষ্মণ দুজনেই তাকে ফিরিয়ে দিলে সে রেগে গিয়ে সীতাকে খেতে উদ্যত হয়।

তারপর রামের নির্দেশে শূর্পণখার নাক কাটা হয়। নাক কাটার প্রতিশোধ নিতে রাবণ সীতাকে তুলে নিয়ে যায়। এখান থেকেই রাম-রাবণের যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। রাবণ সীতাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেটা বিভীষণ মানতে পারেনি। সে অনেকবার রাবণকে অনুনয় করে সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য; তবে রাবণ তার কথায় কর্ণপাত করেনি। রাবণের ভাই কুম্ভকর্ণও সীতাহরণ সমর্থন করতে পারেনি। তবে একসময় কুম্ভকর্ণের কাছে তার পরিবার মুখ্য হয়ে ওঠে।

তবে বিভীষণ তার পরিবারকে ত্যাগ করে রামের সাথে যোগ দেয়। সে রাক্ষসরাজ্যের অনেক গোপন তথ্য দিয়ে রামকে জিততে সাহায্যও করেছিল। এমনকি রামের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে রাক্ষসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেছিল। বিভীষণ হয়তো রামের পক্ষ নিয়ে সত্য ও ধর্মের পক্ষে থেকেছে তবে নিজের পরিবারের সাথে সে শত্রুর মতো আচরণ করেছিল।

সম্পূর্ণ দেখুন

ফারহান সাদিক শাহীন

পরিচালক, প্রমিত বাংলা চর্চা | শিক্ষার্থী (স্নাতক), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

Back to top button
Close